ইসলামিক নিয়মে জানাজা নামায, দাফন ও কবর জিয়ারত

    পোস্টটি শেয়ার করুন !

    জানাজা একটি বিশেষ প্রার্থনা যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সচরাচর এটি জানাজার নামাজ নামে অভিহিত হয়। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মামলম্বীদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া বা সমাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব অর্থাৎ কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অবশ্যই জানাজার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো এলাকা বা গোত্রের পক্ষ থেকে একজন আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। তাই ইসলামিক নিয়মে জানাজা নামায, দাফন ও কবর জিয়ারত সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখা মুসলমান হিসেবে আমাদের অবশ্য কর্তব্য।

    জানাজার নামাযের পদ্ধতি ও করণীয়

    জানাজা একটি বিশেষ প্রার্থনা যা কোনো মৃত মুসলমানকে কবর দেয়ার পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সচরাচর এটি জানাজার নামাজ নামে অভিহিত হয়। মুসলমান অর্থাৎ ইসলাম ধর্মামলম্বীদের জন্য এটি ফরযে কেফায়া বা সমাাজের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব। কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে অবশ্যই জানাজার নামাজ পাঠ করতে হবে। তবে কোনো এলাকা বা গোত্রের পক্ষ থেকে কিছু লোক আদায় করলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়।

    জানাজার নামাজ ও তার ফযীলত

    যখন কোন মুসলমান মারা যায় তখন তার আত্মার শান্তির জন্য বিশেষভাবে কিছু দু’আ করা হয়। ঐ বিশেষ প্রক্রিয়ায় দু’আ করার নাম জানাজার নামাজ। এই নামাযের ফযীলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের জানাজায় শরীক হয়ে নামাজ পড়ে এবং তাকে কবরও দেয় সে দু কীরাত নেকী পায়। প্রত্যেক কীরাত উহুদ পাহাড় সমান নেকী। আর যে ব্যক্তি শুধু জানাজায় নামাজ পড়ে এবং মাটি দেয় না সে এক কীরাত নেকী পাবে (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত, ১৪৪ পৃষ্ঠা)। 

    জানাজার নামাজের জন্য অযু শর্ত

    জানাজার নামাজ শুরুর আগে পবিত্রতা অর্জন করা আবশ্যক। অপবিত্র অবস্থায় জানাজা শুদ্ধ হবে না। ওজু কিংবা গোসল (যদি প্রয়োজন হয়) করে জানাজার নামাজে দাঁড়াতে হবে। কোথাও পানির ব্যবস্থা না থাকলে তায়াম্মুম করে নিতে হবে। বিখ্যাত তাবেয়ী নাফেঅ বলেন, আবদুল্লা ইবনু ওমর বলতেন, কেউ যেন বিনা অযুতে জানাজার নামায না পড়ে (মুঅত্তা ইমাম মালিক, ৮০ পৃষ্ঠা)। তবে হ্যাঁ, অযু করতে গিয়ে জানাজা যদি ছেড়ে যাবার আশংকা থাকে তাহলে ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, তুমি তায়াম্মুম কর এবং নামাজ পড় (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড, ৩০৫ পৃষ্ঠা)।

    জানাজার নামাজের নিয়ম

    চার তাকবীর এর সঙ্গে জানাজার নামাজ আদায় করতে হয়। ঈদের নামাজে তাকবীর দেয়ার সময় হাত তুলতে হয়, কিন্তু জানাজার নামাজে তাকবীর দেয়ার সময় হাত তোলার প্রয়োজন নেই। 


    জানাজার নামাজের নিয়ত

    নিয়ত মানে সংকল্প।জানাজার নামাজের নিয়াত মুখে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই।মুখে উচ্চারণ করে পড়া বিদ”আত।মনে মনে এই নিয়ত থাকবে যে,

    نَوَيْتُ اَنْ اُؤَدِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى اَرْبَعَ تَكْبِيْرَاتِ صَلَوةِ الْجَنَا زَةِ فَرْضَ الْكِفَايَةِ وَالثَّنَا ءُ لِلَّهِ تَعَا لَى وَالصَّلَوةُ عَلَى النَّبِىِّ وَالدُّعَا ءُلِهَذَا الْمَيِّتِ اِقْتِدَتُ بِهَذَا الاِْمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ.

    উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উয়াদ্দিয়া লিল্লাহে তায়ালা আরবাআ তাকরীরাতে সালাতিল জানাযাতে ফারযুল কেফায়াতে আচ্ছানাউ লিল্লাহি তায়ালা ওয়াচ্সালাতু আলান্নাবীয়্যে ওয়াদ্দোয়াউ লেহাযাল মাইয়্যেতে এক্কতেদায়িতু বিহাযাল ইমাম মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতে আললাহু আকবার।

    অনুবাদঃ আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে জানাযা নামাজের চারি তাকবীর ফরযে কেফায়া কেবলামুখী হয়ে ইমামের পিছনে আদায় করার মনস্থ করলাম। ইহা আল্লাহু তায়ালার প্রশংসা রাসূলের প্রতি দরূদ এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া (আর্শীবাদ) আল্লাহ মহান।

    নিয়তের মধ্যে অন্যান্য জামাতের নামাযের নিয়তের ন্যায় ইমাম তাহার অতিরিক্ত খাছ কালাম (আনা ইমামুলেলমান হাজারা ওয়া মাইয়্যাহজুরু) এবং মোক্তাদিগণ তাহাদের অতিরিক্ত খাছ কালামটি পাঠ করিলে। (একতেদাইতু বেহাযাল ইমাম) আর নিয়তের ‘লেহাযাল মাইয়্যেতে’ শব্দটি কেবল পুরুষ লাশের বেলায় বলিতে হইবে, কিন্তু স্ত্রী লাশ হইলে ঐ শব্দটির স্থলে ‘লেহাযিহিল মাইয়্যেতে’ বলিতে হইবে।

    নিয়তের পরে ছানা

    سُبْحَا نَكَ اَللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَا لَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاءُكَ وَلاَ اِلَهَ غَيْرُكَ

    উচ্চারণঃ সুবহা-নাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা।(আরবি উচ্চারণের সাথে বাংলা লিখার ভিন্নতা থাকতে পারে)


    Glory be to You Oh Allah, and praise be to You, and blessed is Your name, and exalted is Your Majesty, and there is none to be served besides You.

    অনুবাদঃ হে আল্লাহ আমরা তোমার পবিত্রতার গুণগান করিতেছি। তোমার নাম মংগলময় এবং তোমার স্তুতি অতি শ্রেষ্ঠ, তুমি ব্যতীত আর কেহই উপাস্য নাই।

    ছানার পরে তাকবীর পাঠ করিয়া তাশাহুদের পরের দরূদ পড়িতে হয়।

    দুরুদ শরীফ

    اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَ اهِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ- اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى اَلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى اِبْرَا هِيْمَ وَعَلَى اَلِ اِبْرَا هِيْمَ اِنَّكَ حَمِيْدٌمَّجِيْدٌ

    উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লিআলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামিদুম্মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ।(আরবি উচ্চারণের সাথে বাংলা লিখার ভিন্নতা থাকতে পারে)

    “O Allah, let Your Blessings come upon Muhammad and the family of Muhammad, as you have blessed Ibrahim and his family. Truly, You are Praiseworthy and Glorious. Allah, bless Muhammad and the family of Muhammad, as you have blessed Ibrahim and his family. Truly, You are Praiseworthy and Glorious”.

    অনুবাদঃ যে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর ঐরূপ আশীর্বাদ অবতীর্ণ কর যেইরূপ আর্শীবাদ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর অবতীর্ণ করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁহার বংশধরগণের উপর সেইরূপ অনুগ্রহ কর যে রূপ অনুগ্রহ ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁহার বংশরগণের উপর করিয়াছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা ভাজন এবং মহামহিম।

    জানাজার নামাযের দোয়া

    اَلَّهُمَّ اغْفِرْلحَِيِّنَاوَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيْرِنَا وَذَكَرِنَا وَاُنْثَا نَا اَللَّهُمَّ مَنْ اَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَاَحْيِهِ عَلَى الاِْسْلاَمِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَىالاِْيمَانِ بِرَحْمَتِكَ يَاَارْ حَمَالرَّحِمِيْنَ

    উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মাগফিরলি হাইয়্যেনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহীদিনা ওয়া গায়িবিনা ও ছাগীরিনা ও কাবীরিনা ও যাকারিনা ও উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলামী ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ ফাহু আলাল ঈমান বেরাহমাতিকা ইয়া আর হামার রাহীমিন।(আরবি উচ্চারণের সাথে বাংলা লিখার ভিন্নতা থাকতে পারে)

    Oh Allah! Forgive those of us that are alive and those of us that are dead; those of us that are present and those of us who are absent; those of us who are young and those of us who are adults; our males and our females. Oh Allah! Whomsoever You keep alive, let him live as a follower of Islam and whomsoever You cause to die, let him die a Believer.

    অনুবাদঃ হে আল্লাহ্! আপনি আমাদের জীবিত-মৃত, উপস্থিত, অনুপস্থিত, ছোট ও বড় নর ও নারীদেরকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ্! আমাদের মাঝে যাদের আপনি জীবিত রেখেছেন তাদেরকে ইসলামের উপরে জীবিত রাখুন, এবং যাদেরকে মৃত্যু দান করেন তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করুন। হে আল্লাহ্! আমাদেরকে তার ছওয়াব হতে বঞ্চিত করবেন না এবং তার মৃত্যুর পর আমাদেরকে পথ ভ্রষ্ট করবেন না।

    লাশ যদি নাবালক ছেলে হয় তবে যে দোয়া পড়তে হবে

    اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًاوْ اَجْعَلْهُ لَنَا اَجْرً اوَذُخْرًا وَاجْعَلْهُ لَنَا شَا فِعًة وَمُشَفَّعًا-

    উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মাজ আলহুলানা ফারতাঁও ওয়াজ আলহুলানা আজরাও ওয়া যুখরাঁও ওয়াজ আলহুলানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়ান।(আরবি উচ্চারণের সাথে বাংলা লিখার ভিন্নতা থাকতে পারে)

    Oh! Allah, make him (this child) a source for our salvation and make him a source of reward and treasure for us and make him an intercessor for us and one whose intercession is accepted.

    অনুবাদঃ হে আল্লাহ! উহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও উহাকে আমাদের পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর এবং উহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী বানাও।

    লাশ যদি নাবালেগা মেয়ে হয় তবে যে দোয়া পড়তে হবে

    اَللَّهُمَّ اجْعَلْهَ لَنَا فَرْطًا وَاجْعَلْهَ لَنَا اَجْرً اوَذُخْرًا وَاجْعَلْهَ لَنَا شَا فِعً وَمُشَفَّعًا

    উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারতাঁও ওয়াজ আলহা লানা আজরাঁও ওয়া যুখরাঁও ওয়াজ আলহা লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফ্ফায়ান।(আরবি উচ্চারণের সাথে বাংলা লিখার ভিন্নতা থাকতে পারে)

    Oh! Allah, make her (this child) a source for our salvation and make her a source of reward and treasure for us and make her an intercessor for us and one whose intercession is accepted.

    অনুবাদঃ হে আল্লাহ! ইহাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী কর ও ইহাকে আমাদের পুরস্কার ও সাহায্যের উপলক্ষ কর। এবং ইহাকে আমাদের সুপারিশকারী ও গ্রহনীয় সুপারিশকারী বানাও। দুইহাত দুইপাশে ঝুলাইয়া ইমাম সাহেব ডানে এবং বামে ছালাম ফিরাইবে।

    জানাজার নামাজের পদ্ধতি

    মৃতকে মুছল্লীদের সামনে রাখতে হবে। মৃত পুরুষ হলে ইমাম মাথা বরাবর দাঁড়াবেন আর মহিলা হলে মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন । অতঃপর প্রথম তাকবীর দিয়ে ছানা পড়বেন, দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দরূদ শরীফ পড়বেন এবং তৃতীয় তাকবীর দিয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করবেন।

    «اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ, اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ»

    তৃতীয় তাকবীর দিয়ে ইমাম উক্ত সাধারণ দো‘আটি পড়বেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত মৃতের জন্য বিশেষ দো‘আ পড়বেন। তা সম্ভব না হলে অন্য যে কোন দো‘আর মাধ্যমে তার জন্য দো‘আ করবেন। মোদ্দাকথাঃ মৃত ব্যক্তির জন্য খাছ কিছু দো‘আ করবেন। কেননা সে দো‘আর খুব বেশী মুখাপেক্ষী। অতঃপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে সামান্য একটু অপেক্ষা করে সালাম ফিরাবেন।

    কোন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে উপস্থিত জীবিতদের আবশ্যক কাজগুলো

    ১) মৃতের চোখ দুটি বন্ধ করে দিবে। যখন আবূ সালমা (রা:) মৃত্যু বরণ করেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চোখ দুটি বন্ধ করে দিয়ে বলেন:

    إنَّ الرُّوحَ إذاَ قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ

    যখন জান কবজ করা হয়, তখন দৃষ্টি তার অনুসরণ করে

    ২)তার জোড় সমূহ নরম করে দিবে, যাতে করে তা শক্ত না হয়ে যায়। আর পেটের উপর ভারী কিছু রেখে দিবে যাতে করে তা ফুলে না যায়।

    ৩)বড় একটি কাপড় দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে দিবে। আয়েশা (রা:) বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর তাঁকে নকশা খচিত একটি কাপড় দিয়ে ঢেঁকে দেয়া হয়।

    ৪)ছহীহ হাদীসের নির্দেশ মোতাবেক মৃত ব্যক্তিকে গোসল, জানাযা সালাত এবং দাফনের ক্ষেত্রে দ্রুততা অবলম্বন করবে।

    ৫)যে এলাকায় তার মৃত্যু হবে সেখানেই তাকে দাফন করা। কেননা ওহুদ যুদ্ধের শহীদদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই দাফন করেছিলেন।

    মৃত ব্যক্তির গোসল

    মৃতকে গোসল দেওয়া ফরযে কেফায়াহ। যারা মৃত ব্যক্তিকে শর‘ঈ পদ্ধতিতে গোসল দিতে জানেন, তারাই মৃতদের গোসলের দায়িত্ব নিবেন। মৃত ব্যক্তিকে এমন এক ঘেরা জায়গায় নিতে হবে, যেখানে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। যারা তাকে গোসল করানোর কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করবে এবং যারা তাদেরকে সহযোগিতা করবে, তারা ছাড়া আর কেউ তার কাছে যাবে না। অতঃপর যে গোসল করাচ্ছে সে সহ অন্য কেউ যাতে তার লজ্জাস্থান দেখতে না পায়, সেজন্য তার লজ্জাস্থানে একটি নেকড়া দিয়ে দেহের কাপড়-চোপড় খুলে ফেলতে হবে। তারপর তাকে পরিষ্কার-পরিছন্ন করতে হবে। অতঃপর সালাতের অযূর ন্যায় তাকে অযূ করাবে।

    আলেমগণ বলেন, মৃত ব্যক্তির নাকে-মুখে পানি প্রবেশ না করাতে; বরং একটা নেকড়া ভিজিয়ে তা দিয়ে মৃতের দাঁতসমূহ এবং নাকের ভেতরে ঘষে পরিষ্কার করে দিতে। এরপর মৃতের মাথা ধুয়ে দিতে হবে। অতঃপর তার সমস্ত শরীর পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। শরীর ধোয়ার সময় মৃত ব্যক্তির ডান অঙ্গ থেকে শুরু করতে হবে। পানিতে বরই পাতা দেওয়া উচিৎ। কেননা তা পরিষ্কারকরণে সাহায্য করে। বরই পাতার ফেনা দিয়ে মৃতের মাথা, দাড়ি ধুয়ে দিতে হবে। তবে শেষ বার ধোয়ানোর সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশাতে হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাকে গোসলদানকারী মহিলাগণকে বলেছিলেন, ‘শেষবার ধোয়ার সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশাবে’। গোসল শেষে মৃতের গায়ের পানি মুছে ফেলে তাকে কাফনের কাপড় পরাতে হবে।

    ১.মৃতের গোসল, কাফন, জানাযার নামাজ/সালাত এবং দাফন করা ফরযে কেফায়া।

    ২.গোসল দেয়ার ক্ষেত্রে যার ব্যাপারে মৃত ব্যক্তি ওছিয়ত করে গিয়েছে, সর্বপ্রথম সেই ব্যক্তি হকদার। তারপর তার পিতা। তারপর অপরাপর নিকটাত্মীয়। আর মহিলার গোসলে প্রথম হকদার হল তার ওছিয়তকৃত মহিলা। তারপর তার মা। তারপর তার মেয়ে। তারপর অন্যান্য নিকটাত্মীয় মহিলাগণ।

    ৩.স্বামী-স্ত্রী পরষ্পরকে গোসল দিতে পারবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রা:)কে বলেন তোমার কোন অসুবিধা নেই, তুমি যদি আমার আগে মৃত্যু বরণ কর, তবে আমি তোমার গোসল দিব। আর আবু বকর (রা:) ওছিয়ত করেছিলেন যে, তার স্ত্রী যেন তাঁকে গোসল দেয়।

    ৪. বয়স যদি সাত বছরের কম হয় তবে মৃত ব্যক্তি নারী হোক বা পুরুষ, যে কোন পুরুষ বা মহিলা তার গোসল দিতে পারবে।

    ৫.গোসলের জন্য পুরুষের ক্ষেত্রে পুরুষ আর নারীর ক্ষেত্রে নারী যদি না পাওয়া যায় তবে তার গোসল দিবে না। বরং তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে। এর পদ্ধতি হল, উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন তার হাত দুটি পাক মাটিতে মারবে। তারপর তা দ্বারা মৃতের মুখমন্ডল ও উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করে দিবে।

    ৬.কোন কাফেরকে গোসল দেয়া এবং দাফন করা মুসলমানের উপর হারাম। আল্লাহ্ বলেনঃ ولاَ تُصَلِّ عَلىَ أحَدٍ مِنْهُمْ ماَتَ أبَداً

    ৭.আপনি তাদের(কাফের ও মুনাফিকদের) কখনই জানাযা সালাত আদায় করবেন না।

    ৮.গোসল দেয়ার সুন্নাত হল, প্রথমে তার লজ্জাস্থান ঢেঁকে দেবে, তারপর তার সমস্ত কাপড় খুলে নিবে। অত:পর তার মাথাটা বসার মত করে উপরের দিকে উঠাবে এবং আস্তে করে পেটে চাপ দিবে, যাতে করে পেটের ময়লা বেরিয়ে যায়। এরপর বেশী করে পানি ঢেলে তা পরিস্কার করে নিবে। তারপর হাতে কাপড় জড়িয়ে বা হাত মুজা পরে তা দিয়ে উভয় লজ্জা স্থানকে (নযর না দিয়ে) ধৌত করবে। তারপর বিসমিল্লাহ্ বলবে এবং সালাতের ন্যায় ওযু করাবে। তবে মুখে ও নাকে পানি প্রবেশ করাবে না। বরং ভিজা কাপড় আঙ্গুলে জড়িয়ে তা দিয়ে তার উভয় ঠোঁটের ভিতর অংশ ও দাঁত পরিস্কার করবে। একইভাবে নাকের ভিতরও পরিস্কার করবে।

    ৯.পানিতে কুল পাতা মিশিয়ে তা ফুটিয়ে গোসল দেয়া মুস্তাহাব। বরই পাতা দিয়ে ফোটানো পানি দ্বারা মৃতের মাথা ও দাঁড়ি ধৌত করতে হবে। প্রথমে শরীরের ডান পাশের সামনের দিক ধৌত করবে। তারপর পিছন দিক তারপর বাম দিক ধৌত করবে। এভাবে তিনবার গোসল দিবে। প্রতিবার হালকা ভাবে পেটে হাত বুলাবে এবং ময়লা কিছু বের হলে পরিস্কার করে নিবে।

    ১০.গোসলের সময় সাবান ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজন মোতাবেক তিনবারের বেশী সাত বা ততোধিক গোসল দিতে পারে। শেষবার কর্পুর মিশ্রিত করে গোসল দেয়া সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কন্যা যায়নাবের (রা:) শেষ গোসলে কর্পুর মিশ্রিত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

    ১১.মৃতের মোচ বা নখ যদি বেশী বড় থাকে তবে তা কেটে দেয়া মুস্তাহাব। তবে বগল বা নাভীর নীচের চুল কাটা যাবে না।

    ১২.সাত বার গোসল দেয়ার পরও যদি পেট থেকে ময়লা (পেশাব বা পায়খানা) বের হতেই থাকে তবে উক্ত স্থান ধুয়ে সেখানে তুলা বা কাপড় জড়িয়ে দিবে। তারপর তাকে ওযু করাবে।

    ১৩.কাফন পরানোর পরও যদি ময়লা বের হয়, তবে সেভাবেই রেখে দিবে আর গোসল না দিয়ে। কেননা তা অসুবিধার ব্যাপার।

    ১৪.মৃতের চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজন নেই। তবে নারীর ক্ষেত্রে তার চুলগুলোতে তিনটি বেণী বেঁধে তা পিছনে ছড়িয়ে দিবে।

    ১৫.হজ্জ বা ওমরায় গিয়ে ইহরাম অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, তবে তাকে কুল পাতা মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল দিবে। কিন্তু কোন সুগন্ধি ব্যবহার করবে না এবং পুরুষ হলে কাফনের সময় তার মাথা ঢাঁকবে না। বিদায় হজ্জে জনৈক ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন তাকে কোন সুগন্ধি লাগাবে না, এবং তার মাথা ঢাঁকবে না। কেননা সে ক্বিয়ামত দিবসে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে।

    ১৬.শহীদ ব্যক্তিকে গোসল দিবে না, এবং তাকে তার সাথে সংশ্লিষ্ট কাপড়েই দাফন করবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহুদের শহীদদের ব্যাপারে আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে গোসল ছাড়া তাদের পরিহিত কাপড়ে দাফন করা হবে। এমনিভাবে তাদের সালাতে জানাযাও পড়েন নি।

    ১৭.গর্ভস্থ সন্তান যদি চার মাস অতিক্রম হওয়ার পর পড়ে যায়, তবে তার গোসল ও জানাযার সালাত আদায় করবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন মাতৃগর্ভে সন্তানের বয়স যখন চার মাস অতিক্রম করে তখন সেখানে একজন ফেরেস্তা প্রেরণ করা হয়। সে তাতে রূহ ফুঁকে দেয়। আর তার বয়স যদি চার মাসের কম হয়, তবে তাতে প্রাণ না থাকার কারণে সাধারণ একটি মাংসের টুকরা গণ্য হবে। যা কোন গোসল বা জানাযা ছাড়াই যে কোন স্থানে মাটিতে পুঁতে দেয়া যাবে।

    ১৮.মৃত ব্যক্তি আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারণে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার কারণে বা পানি না পাওয়ার কারণে যদি তাকে গোসল দেয়া সম্ভব না হয়, তবে উপরের নিয়মে তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে।

    মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানোর পদ্ধতি

    ১.মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানো ওয়াজিব। আর তা হবে তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে। যাবতীয় ঋণ, ওছিয়ত এবং মীরাছ বন্টনের আগে কাফনের খরচ তার সম্পত্তি থেকে গ্রহণ করতে হবে।

    ২.মৃতের সম্পত্তি থেকে যদি কাফনের খরচ না হয় তবে তার পিতা বা ছেলে বা দাদার উপর দায়িত্ব বর্তাবে। যদি এমন কাউকে না পাওয়া যায় তবে বায়তুল মাল থেকে প্রদান করবে। তাও যদি না পাওয়া যায় তবে যে কোন মুসলমান প্রদান করতে পারে।

    ৩.পুরুষকে তিনটি লেফাফা বা কাপড়ে কাফন পরানো মুস্তাহাব। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সুতী সাদা তিনটি কাপড়েই কাফন দেয়া হয়েছিল। কাফনের কাপড়ে সুগন্ধি মিশ্রিত করা মুস্তাহাব। প্রথমে সাতটি ফিতা বিছিয়ে দিবে। তারপর (ফিতাগুলোর উপর) কাপড় তিনটি একটির উপর অন্যটি বিছাবে। অত:পর মাইয়্যেতকে চিৎ করে শুইয়ে দিবে। এসময় তার লজ্জাস্থানের উপর একটি অতিরিক্ত কাপড় রেখে দিবে। তার নাক, কান, লজ্জাস্থান প্রভৃতি জায়গায় সুগন্ধি যুক্ত তুলা লাগিয়ে দেয়া মুস্তাহাব। সম্ভব হলে সমস্ত শরীরে সুগন্ধি লাগাবে। তারপর প্রথম কাপড়টির ডান দিক আগে উঠাবে, এরপর বাম দিকের কাপড়। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাপড়ে করবে। তারপর অতিরিক্ত কাপড়টি টেনে নিবে এবং ফিতাগুলো দিয়ে গিরা দিবে। আর তা কবরে রাখার পর খুলে দিবে। ফিতার সংখ্যা সাতের কম হলেও অসুবিধা নেই। এভাবে মৃত ব্যক্তিকে ৭টি বাঁধন দিবে।

    ৪. মহিলাকে পাঁচটি কাপড়ে কাফন দিবে। লুংঙি যা নীচের দিকে থাকবে, খেমার বা ওড়না যা দিয়ে মাথা ঢাঁকবে, কামীছ (জামা) এবং দুটি বড় লেফাফা বা কাপড়। (অবশ্য তিন কাপড়েও তাকে কাফন দেয়া জায়েয)।

    দাফনের নিয়ম

    ১.মৃতের খাটিয়া কাঁধে রেখে বহন করা মুস্তাহাব। হাদীসের নির্দেশ মোতাবেক লাশ দ্রুত বহণ করা সুন্নাত। সে সময় মানুষ লাশের সামনে, পিছনে, ডাইনে, বামে যে কোন দিক দিয়ে চলতে পারবে।

    ২.লাশের সাথে চলবে যে ব্যক্তি তার জন্য খাটিয়া মাটিতে রাখার আগে বসা মাকরূহ।

    ৩.তিনটি সময়ে সালাত আদায় করতে এবং মুরদা দাফন করতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। 

    • সূর্য উদয়ের সময়, যে পর্যন্ত তা কিছু উপরে না উঠে যায়।
    • সূর্য মাথার উপর থাকার সময়, তা পশ্চিমাকাশে যে পর্যন্ত ঢলে না যায়।
    • সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়, যে পর্যন্ত তা পুরাপুরি ডুবে না যায়।

    ৪.দিনে বা রাতে যে কোন সময় লাশ দাফন করা যায়। লাশ কবরে প্রবেশ করানোর সময় তা মহিলার লাশ হলে আলাদা কাপড় দিয়ে ঢেঁকে দিবে।

    ৫.সুন্নাত হল কবরের পায়ের দিক থেকে লাশকে কবরে নামানো। পায়ের দিকে দিয়ে লাশ কররে রাখা হচ্ছে। সম্ভব না হলে, ক্বিবলার দিক থেকে কবরে নামাবে। কিবলার দিক থেকে লাশ কবরে রাখা হচ্ছে।

    ৬.লাহাদ তথা বুগলী কবর হল উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন লাহাদ (বুগলী কবর) হল আমাদের জন্য আর শাক্ব বা বাক্স কবর হল অন্যদের জন্য। লাহাদ বা বুগলী কবর শাক্ব বা বক্স কবর।

    ৭.লাশের দুর্গন্ধ বের হওয়া এবং হিংস্র প্রাণী থেকে হেফাযত করার জন্য বেশী গভীর করে কবর খনন করা সুন্নাত।

    ৮.যারা লাশ কবরে নামাবে তাদের জন্য সুন্নাত হল, এই দু’আ পড়া: (بِسْمِ اللهِ وَعَلىَ سُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ) উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া আলা সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ। অর্থঃ আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের সুন্নাত এর উপর। অথবা এটা পড়বে: (بِسْمِ اللهِ وَعَلىَ مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ) উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ অর্থ: আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের তাঁর মিল্লাতের উপর।

    ৯.লাশকে কবরের মধ্যে কিবলা মুখী করে ডান কাতের উপর করে রাখা সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন জীবিত এবং মৃত সব অবস্থায় তোমাদের কিবলা হল কাবা।

    ১০.লাশের মাথার নীচে কোন ইট-পাথর বা বালিশ রাখবে না এবং তার চেহারার কাপড়ও খোলা যাবে না।

    ১১.তারপর কবরের মুখ ইট এবং মাটি দিয়ে বা বাঁশ/চাটাই ও মাটি দিয়ে পূর্ণ করে দিবে।

    ১২.উপস্থিত মুসলমানদের জন্য সুন্নাত হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণে প্রত্যেকে উক্ত কবরে তিন খাবল করে মাটি দেয়া।

    ১৩.সুন্নাত হল কবরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের মত উটের চুঁড়ার মত – মাত্র অর্ধ হাত পরিমাণ উঁচু করা।

    ১৪.এরপর কবরের উপর কিছু পাথর কুচি ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর পানি ছিটিয়ে দিবে। শেষে কবরের মাথার দিকে একটি পাথর রেখে দিবে যাতে করে তা চেনা যায় এবং তার অবমাননা না হয়। যেমনটি ঊছমান বিন মাযঊন (রা:) এর কবরে করেছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

    ১৫.কবরকে পাকা করা, তার উপর ঘর উঠানো, তার নাম পরিচয় লিখা, তার উপর বসা, চলা, হেলান দিয়ে বসা সবই ছহীহ হাদীস অনুযায়ী হারাম কাজ।

    ১৬.খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া এক কবরে একের অধিক ব্যক্তিকে দাফন করা মাকরূহ।

    ১৭.মৃতের পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী করে তাদের কাছে পাঠানো মুস্তাহাব। হযরত জাফর বিন আবী তালেবের শাহাদাতের সংবাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন: তোমরা জাফর পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী কর, কেননা তারা বিপদগ্রস্থ হয়েছে।

    ১৮.মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য খানা প্রস্তুত করা জায়েয নয়। ছাহাবায়ে কেরাম (রা:) মানুষের জন্য খানা প্রস্তুত করা এবং শোক বাণী জানানোর জন্য মৃতের বাড়ীতে একত্রিত হওয়াকে নিষিদ্ধ নিয়াহা বা মৃতের জন্য বিলাপের মধ্যে গণ্য করতেন।

    ১৯.শুধু মাত্র উপদেশ গ্রহণ এবং মৃতের জন্য দু’আ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা পুরুষদের জন্য সুন্নাত। এরশাদ হচ্ছে: পূর্বে আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত করতে পার। কেননা তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করাবে।

    ২০.তবে নারীরা অধিকহারে কবর যিয়ারত করবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক কবর যিয়ারতকারীনীদের লানত করেছেন।

    ২১.কবর যিয়ারতের সময় এই দু’আ পাঠ করবে: السلام عليكم داَرَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِيْنَ وإناَّ إنْ شاَءَ اللهُ بِكُمْ لَلاَحِقُوْنَ نَسْأَلُ اللهَ لَناَ وَلَكُمُ الْعاَفِيَةَ।

    উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বওমিম মুমিনীন। ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকূন। নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াহ।

    অর্থ: হে কবরের অধিবাসী মুমিনগণ! আপনাদের প্রতি শান্তি ধারা বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আমরাও আপনাদের সাথে এসে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ্। আমরা আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।

    ২২.মুসলিম ব্যক্তি কবর জিয়ারতে খুবই সতর্ক থাকবে। তা স্পর্শ করবে না, তাযীম করবে না, বরকত হাছিলের কারণ মনে করবে না, দু’আ চাইবে না। কেননা এগুলো শির্ক বা শির্কের মাধ্যম।

    ২৩.মৃতের পরিবারকে শোক বার্তা জানানোর সময় এই দু’আ করা সুন্নাত: إنَّ ِللهِ ماَ أخَذَ وَلَهُ ماَ أعْطىَ وكُلُّ شَيْءٍ عِنْدَهُ بِأجَلٍ مُّسَمىَّ فاَصْبِرْ واَحْتَسِبْ। উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি মা আখাযা ওয়া লাহু মা আত্বা। ওয়া কুল্লু শাইয়িন ইনদাহু বি আজালিম মুসাম্মা। ফাসবির ওয়াহতাসিব। অর্থ: তিনি যা নেন এবং দান করেন তার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তাঁর নিকট প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দষ্ট সময় রয়েছে। তাই তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহর নিকট থেকে এর প্রতিদান প্রার্থনা কর।

    ২৪.মৃতের জন্য শুধু তিন দিন শোক পালন করা বৈধ। তবে মৃতের স্ত্রীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করা ওয়াজিব, আর সে গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক পালন করবে।

    ২৫.মৃতের জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা, কপোল চাপড়ানো, মাতম করা, চুল, জামা-কাপড় ছেড়া ইত্যাদি সবই হারাম কাজ যা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।

    কবর খনন 

    কবর দৈর্ঘ্য লাশ অপেক্ষা কিছু বড় এবং প্রস্থ দৈর্ঘ্যর অন্তত অর্ধেক পরিমাণ খনন করিবে। গভীরতায় বুজ অথবা নাভী সমান করিবে। কবর সাধারণত দুই রকম করা হয়। (১) শক কবর (খাড়া কবর) এবং (২) লহদ কবর।

    শক কবর হইলে উপর হইতে একেবারে খাড়া ভাবে সোজা নীচের দিকে বরক অথবা নাভী পর্যন্ত খনন করা। এই প্রকার কবর হইতে অনেক সময় বন্য জন্তুরা লাশ টানিয়া উপরে উঠাইয়া ফেলে। কাজেই ইহা মোটেই নিরাপদ নয়।

    লহদ কবর হইল উপর হইতে কিছুদূর পর্যন্ত খাড়া ভাবে খনন করিয়া তারপর এক পার্শ্বে বাকা করিয়া মাটির নীচে এই পরিমাণ স্থান খনন করতে হবে যাহাতে সচ্ছন্দে একটি লাশ তার মধ্যে শোয়াইয়া রাখা যায়। এই প্রকার কবর হইতে কোন জানোয়ার কর্তৃক লাশ আক্রান্ত হইবার ভয় থাকেনা। বর্তমানে প্রায় সব দেশেই এই জাতীয় কবরই বেশী খনন করা হয়ে থাকে।

    মৃতদেহ কবরস্থানে নিবার বিবরণ

    মৃতদেহের খাঁটিয়া কবরস্থানে লইয়া যাওয়া ফরযে কেফায়া। কোন এক প্রশস্ত অথচ পবিত্র স্থানে বসিয়া জানাযার নামায আদায় করিয়া লাশ বহন করিয়া কবরস্থানে লইয়া যাইবে। মৃত ব্যক্তির চার জন পরহেজগার নিকট আত্মীয় লাশের খাটের চারটি পায়া ধারণ করিয়া কাঁধে উঠাইয়া লইবে। লাশের মাথা সম্মুখে রাখিয়া চলিতে থাকিবে। কবরস্থান বেশী দূরে হইলে মাঝে মাঝে খাট বহনকারীগণ স্থান পরিবর্ত করিয়া স্ব-স্ব কোণা হইতে বিপরীত কোণায় গিয়া খাঁট ধারণ করিবে। লাশ কোন ক্ষুদ্র শিশুর হইলেও একজন লোকে ও ছোট খাঁটে বহন করিবে না। কবরস্থানে পৌঁছাইয়া কবরের পশ্চিম পার্শে জানাযার খাট উত্তর মুখী করিয়া নামাইয়া রাখিবে।

    মুক্তাদীদের লাইন কটা হবে?

    মালিক ইবনু হোরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, যে মুসলমানের মরার পর তার জানাজায় মুসলমানদের তিন লাইন লোক নামাজ পড়ে তার জন্য (আল্লাহতা’য়ালা ক্ষমা) অপরিহার্য করে দেন। তাই জানাজা ইমাম মোক্তাদীর সংখ্যা যখন কম মনে করতো তখন মালেক (রা.) এই হাদীসটির ভিত্তিতে তিনটি লাইন করে নিতেন (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনু মাজা, মিশকাত, ১৪৭ পৃষ্ঠা)।

    মুসল্লী সংখ্যা কত হওয়া উচিত?

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন মুসলমানের জানাজায় এমন চল্লিশজন লোক যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেননি যদি শরীক হয়ে ঐ লাশের জন্য দু’আ  করে তাহলে আল্লাহতা’য়ালা তাদের সুপারিশ নিশ্চয়ই কবুল করবেন (মুসলিম, মিশকাত, ১৪৫)

    বেনামাযী, ফাসেকের ও আত্মহত্যাকারীর জানাজা

    জাবের (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একজন আত্মহত্যাকারীর লাশ আনা হলে তিনি তার জানাজা পড়েননি (মুসলিম, বুলুগুল মারাম, ৩৯ পৃষ্ঠা)। এইরূপ জোহায়না গোত্রের এক ব্যক্তি খায়বারের দিনে গনীমতের (জেহাদেলব্ধ) মাল চুরি করায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা না পড়ে বলেন, তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ে নাও (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী)। উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে ওলামায়ে কিরাম বলেন, চোর-ডাকাত এবং আত্মহত্যাকারীর জানাজা আলেম ও পরহেযগার লোক না পড়ে সাধারণ লোক পড়বে। যাতে অন্যান্য লোকেরা সাবধান হয়ে যায় এবং শিক্ষা পায়।

    জানাজার নামাজের ইমাম কে হওয়া উচিত?

    মাইয়েত যদি জীবদ্দশায় তার জানাজা পড়াবার জন্য কাউকে অসিয়্যত করে থাকে তাহলে সেইই জানাজা পড়াবে। যেমন-আবুবাকর ওমরকে, ওমর সুহাইবকে এবং তার পুত্র হাযেরকে, ইবনু মসউদ ইবনু যুবায়রকে এবং আয়েশা আবু হুরায়রাকে তাদের জানাজা পড়াবার জন্য অসিয়্যত করেছিলেন। তাই তারাই জানাজা পড়িয়েছিলেন। ফলে এটা ইজমায় পরিণত হয় (আসইয়লাহ, ১ম খণ্ড, ২৬৫ পৃষ্ঠা)।

    ইমাম নবভী বলেন, অসিয়্যতের পর অলী বা মাইয়েতের ঘনিষ্ট আত্মীয় জানাজা পড়াবে। তারপর মসজিদের ইমাম। ঘনিষ্ট আত্মীয়দের মধ্যে প্রথমে পিতা, তারপর দাদা, তারপর পুত্র, তারপর পৌত্র, তারপর ভাই (রওযাতুত তলিবীন, ২য় খণ্ড, ১২১ পৃষ্ঠা)।

    মাস’আলা মাসায়েলঃ

    জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান কি?

    সূরা ফাতিহা পাঠ সালাতের একটি রুকন। মুহাম্মাদ (সাঃ)বলেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার সালাত হয় না।[ইমাম বুখারী উবাদাহ ইবনে ছামিত (রা) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৭৫৬; মুসলিম, ‘সালাত’ অধ্যায়, হা/৩৯৪]

    এক্ষেত্রে জানাযার সালাত এবং অন্য সালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা জানাযাও এক প্রকার সালাত। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাধারণ ঘোষণা, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার সালাত হবে না’ জানাযার সালাতকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।

    জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহার পরে অন্য সূরা বা আয়াত মিলানোর হুকুম কি?

     জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহার পরে ক্বুরআনের অন্য কোন আয়াত বা সূরা পড়লে কোনো সমস্যা নেই। তবে যেন ক্বিরাআত লম্বা না করে। আর শুধু সূরা ফাতিহা পড়লেও তা যথেষ্ট হবে। কেননা জানাযার সালাত লম্বা না করে খাটো করে পড়তে হয়। সেজন্যই তো এই সালাতে ছানা পড়তে হয় না; বরং আঊযুবিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা পড়তে হয়।

    জানাযার সালাত পড়ানোর ক্ষেত্রে কে বেশী উত্তম? ইমাম নাকি মৃতের অভিভাবক?

    যদি কারো জানাযার সালাত মসজিদে পড়া হয়, তাহলে মসজিদের ইমাম বেশী উত্তম। কেননা মুহাম্মাদ (সাঃ)বলেন, ‘কেউ কারো কর্তৃত্বের স্থলে ইমামতি করবে না’। [মুসলিম, ‘মসজিদসমূহ’ অধ্যায়, হা/৬৭৩]

    কিন্তু মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যদি তার জানাযা হয়, তাহলে মৃতের অছিয়ত প্রাপ্ত ব্যক্তিই জানাযা পড়ানোর ক্ষেত্রে উত্তম। তবে যদি তার অছিয়ত প্রাপ্ত কেউ না থাকে, তাহলে তার নিকটতম ব্যক্তি উত্তম হিসাবে বিবেচিত হবে।

    জানাযার নামাজে মুহাম্মাদ (সাঃ)এর উপর দরূদ পড়ার হুকুম কি?

    ওলামায়ে কেরামের প্রশিদ্ধ উক্তি অনুযায়ী জানাযার সালাতে রাসূলের উপর দরূদ পড়া ওয়াজিব। মুসল্লিরা জানাযায় কখনো রাসূলের উপর দরূদ পরিত্যাগ করবে না।

    জানাযার প্রতি তাকবিরে হাত উঠানো কি সুন্নত ?

    জানাযার প্রতি তাকবিরে রফউল ইয়াদাইন করা সুন্নত। বর্ণিত আছে যে, সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর ও আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস প্রতি তাকবিরে হাত উঠাতেন। (দারা কুতনি)

    কারো জানাযার এক বা একাধিক তাকবীর ছুটে গেলে সে কি তার ক্বাযা আদায় করবে? সে ইমামের সাথে সালাত শুরু করবেইবা কিভাবে?

    ইমামকে সালাতের যে অবস্থাতে পাবে, ঠিক সেই অবস্থা থেকেই ইমামের সাথে সালাত শুরু করবে। মুহাম্মাদ (সাঃ)বলেন, ‘তোমরা  (ইমামের সাথে) সালাতের যতটুকু পাও, ততটুকু আদায় কর। আর যতটুকু তোমাদের ছুটে যায়, ততটুকু পূরণ কর’।[বুখারী, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৬৩৫]

    যেমন কেউ যদি ইমামকে দ্বিতীয় তাকবীরে পায়, তাহলে সেটা হবে তার জন্য প্রথম তাকবীর।  তাহলে সে তাকবির বলে সূরা ফাতিহা পড়বে, ইমাম যখন তৃতীয় তাকবীর বলবে তখন সে দ্বিতীয় তাকবীর বলে রাসূলের উপর দরুদ পড়বে, ইমাম যখন চতুর্থ তাক্ববীর দিয়ে সালাম ফিরাবে তখন সে সালাম না ফিরিয়ে তৃতীয় তাকবীর বলে দু’আ পড়বে অতঃপর চতুর্থ তাকবির দিয়ে সালাম ফিরাবে।

    কোন মৃতের উপর একাধিক বার জানাযা পড়ার হুকুম কি?

    বিশেষ কারণে একাধিক বার জানাযা পড়া যেতে পারে, যেমন জানাযা শেষে কিছু লোক নতুন করে উপস্থিত হলো, তাহলে এরা মৃতের উপর দাফনের পূর্বে বা পরে জানাযা পড়তে পারবে। এমনিভাবে যে একবার সবার সাথে জানাযা পড়েছে সে আগত লোকদের সাথে লাশ দাফনের পরে ও পুনরায় জানাযা পড়তে পারবে। কারণ এতে সালাত আদায়কারী ও মৃত ব্যক্তি উভয়ের জন্য কল্যাণ রয়েছে।

    ইমামের সাথে ফরয সালাত পায় নি এমন কেউ জানাযা সালাতের জন্য মৃতকে সামনে নেওয়া অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলে সে কি ইমামের সাথে জানাযার সালাত পড়বে নাকি আগে ফরয সালাত পড়বে?

    সে ইমামের সাথে আগে জানাযা পড়ে নিবে। কেননা ফরয সালাত পরে আদায় করে নেওয়া যাবে। কিন্তু জানাযা সালাত শেষে মৃতকে নিয়ে চলে গেলে সে আর জানাযা পড়ার সুযোগ পাবে না।

    জানাযার নামাজ কি মাঠে পড়া উত্তম না মসজিদে?

    সম্ভব হলে মাঠে পড়াই উত্তম। তবে মসজিদে পড়াও জায়েয আছে, যেমন আয়শা (রাদি) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) বয়জা নামীয় ব্যক্তির দু’পুত্রের জানাযা মসজিদেই পড়েছেন। (মুসলিম)

    জানাযার সালাতের ফজিলাত কি?

    জানাযার সালাত আদায় করলে এক কিরাত নেকি পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,

    من شهد الجنازة حتى يصلى عليها فله قيراط ومن شهدها حتى تدفن فله قيراطان» قيل يارسول الله: وما القيراطان ؟ قال: مثل الجبلين العظيمين

    -যে ব্যক্তি জানাযায় অংশগ্রণ করত নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে এক’কিরাত নেকি পাবে, আর যে জানাযায় অংশ গ্রহণ করে দাফন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে দু’কিরাত নেকি পাবে”। জিজ্ঞসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! দু’কিরাত বলতে কি বুঝায়? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ “দুইটি বড় পাহাড় সমপরিমাণ”। (বুখারি ও মুসলিম)

    জানাযার নামাযের ইমাম যদি ভুলবশত দুই তাকবীর বলিয়া সালাম ফিরাইয়া থাকেন তবে আবার দুই তাকবীর বলিয়া সালাম ফিরাইবেন। এইরূপ তিন তাকবীর বলিয়া সালাম ফিরাইলে পুনরায় এক তাকবীর বলিয়া ছালাম ফিরাইবেন। ইমাম ভুলে পাঁচ তাকবীর বললে মোক্তাদিগণ চারি তাকবীর পর্যন্ত বলিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিবেন এবং ইমামের সঙ্গে একত্রেই সালাম ফিরাইবেন।

    কোন লোক জানাযার নামাযে ইমামের কয়েকটা তাকবীর না বলার পর আসিয়া শরীক হইলে সে তাহরীমার তাকবীর না বলিয়া কিছু সময় ইমাম যখন তাকবীর বলিবেন অমনি তাহার সহিত তাকবীর বলিয়া নামাযে শরীক হইয়া যাইবে। ইহাই তাহার জন্য তাকবীরে তাহরিমা হইবে। তারপর যে তাকবীরগুলি ইমামের সংগে না পাইয়াছে তাহাই বলিবে। তাহাকে আর কিছুই পড়িতে হইবে না।

    কোন লোক ইমামের চার তাকবীর হইয়া যাওয়ার পর নামাজে শরীক হইলে সে ইমামের সালাম ফিরাইবার পরে শুধু তাকবীর গুলো বলিয়াই সালাম ফিরাইবে। কাহারও মৃত্যু সংবাদ শুনিয়া দূরবর্তী এলাকায় তাহার জন্য গায়েবানা নামায পড়িলে জায়েয হইবে।

    কোন লোককে জানাযার নামায ব্যতীত দাফন করিলে তাহার উপরে তিনদিন পর্যন্ত জানাযার নামায পড়া জায়েয আছে। কোন সন্তান মৃত ভূমিষ্ট হলে তাহার জন্য জানাযার নামায পড়িতে হয় না। মসজিদের অভ্যন্তরে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ। কেহ জানাযা নামাযের দোয়া না জানিলে সে শুধু আললাহুম্মাগ ফেরলিল মুমিনীনা ওয়াল মুমিনাতে বলবে।

    জানাজার নামাজের সময়ের করণীয়

    এই পৃথিবীতে জীবন চলার পথে প্রত্যেক মানুষই ভাল-মন্দ নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। ভুলের ঊর্ধ্বে কেউ এই নশ্বর পৃথিবীতে নেই। সেজন্য কোন মানুষের মৃত্যু খবর শোনামাত্র তার ভুল-ত্রুটিগুলো সবারই ক্ষমা করে দেয়া উচিত। মৃত ব্যক্তি যদি কারো কাছে ঋণ থাকেন তাহলে তার ওয়ারিশগণ পরিশোধ করে দেবেন। আর যদি তারা অসচ্ছল হয় ও ঋণদাতা স্বচ্ছল হন তাহলে ক্ষমা করে দেয়াই হবে মহোত্তম কাজ।

    এক স্থানে জানাজা পড়তে গিয়ে একটি অভিনব ঘটনার সূত্রপাত হলো। সবাই জানাজা নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। এমন সময় ইমাম সাহেব বলছেন, মৃত ব্যক্তির কত ওয়াক্ত নামাজ কাযা গিয়েছে? পরিবারের লোকজন সঠিক হিসাব দিতে পারছিলেন না।

    ইমাম সাহেব বললেন, যত ওয়াক্ত নামাজ কাযা গিয়েছে তা হিসাব করে কাফফরা না দিলে জানাজা নামাজ পড়ানো যাবে না। এভাবে সময়ক্ষেপণ করায় উপস্থিত মুসল্লিরা বিব্রত হচ্ছিলেন। আসলে ঐ বিষয়টি ইমামের পরিষ্কার জানা নেই যে জানাজা আটকিয়ে রেখে নামাজের কাফফারা আদায় করার কোন বিধান কুরআন হাদিসে নেই।

    কারণ যতক্ষণ মানুষের সেন্স থাকে ততক্ষণ ইশারায় হলেও নামাজ পড়তে হবে। আর কাযা হলে কাযা আদায় করবেন। আর যার কাযা আদায় করা সম্ভব হয়নি তিনি তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এর জন্য তাকে কোনো কাফফারা দেয়ার প্রয়োজন নেই।

    কবর জিয়ারত

    ইমাম ইবনুল কায়িম (রহ.) বলেছেন, রাসূল (সা.) যখন কবর জিয়ারত করতেন, কবরের অধিবাসীদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের জন্য ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যেই জিয়ারত করতেন।

    কবর জিয়ারতের নিয়ম

    বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূল (সা.) প্রায় সময়ই কবর জিয়ারত করতেন শেষ রাতে। তাই সম্ভব হলে শেষ রাতে কবর জিয়ারত করা উত্তম। কেননা মন তখন অধিক নরম থাকে। তাছাড়া অন্য সময়ও কবর জিয়ারত করা রাসূল (সা.) থেকে প্রমাণিত। অধিকাংশ আলেমের মতে, জুতা-স্যান্ডেল পায়ে রেখে কবরের কাছে যাওয়া যায়। তবে ইমাম আহমদের মতে, প্রয়োজন না হলে জুতাসহ যাওয়া মাকরুহ।

    জিয়ারতকারী যখন কবরের কাছে পৌঁছবে, মৃত ব্যক্তির মাথা বরাবর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবে। জিয়ারতকারী কবরবাসীকে সম্বোধন করে সালাম দেবে এবং তাদের জন্য মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করবে। এ ক্ষেত্রে হাত তুলে ও না তুলে উভয় অবস্থায় দোয়া করা যাবে। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বাকি কবরস্থানে পৌঁছে হাত উঠিয়ে দোয়া করেছিলেন।

    কবর জিয়ারতের দোয়া

    হজরত বুরায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এ দোয়া শিক্ষা দিতেন, যখন তারা কবর যিয়ারাতে বের হতেন। 

    উচ্চারণ : আসসালামু আলা আহলিদ্দিইয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়ালমুসলিমীন, ওয়া ইয়ারহামুল মুস্তাক্বদিমীনা মিন্না ওয়ালমুসতা’খিরিন। ওয়া ইন্না আল্লাহু ‍বিকুম লালাহিকুন। নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আ’ফিয়াহ (মুসলিম, মিশকাত)

    অর্থ : হে কবরবাসী মুমিন মুসলমান! তোমাদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। আমরাও তোমাদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য এবং তোমাদের নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।

    মহিলাদের কবর জিয়ারত

    মহিলারা পর্দা ঠিক রেখে জিয়ারত করতে পারবে। পর্দা যদি নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে তবে জিয়ারত করতে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে। নবীগন ও অলীগনের মাযার এবং মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী, চাচা-চাচী এক কথায় নিকট আত্মীয়দের কবর মায়া-মুহাব্বত ও ফজিলতের জন্য জিয়ারত করা যাবে।হাদিসে মহিলাদের খুব ঘন-ঘন কবর জিয়ারতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং শুধুমাত্র তাদেরই লানত করা হয়েছে।

    প্রতিনিয়তই আমাদের আপনপর কেউ না কেউ মৃত্যু বরন করছেন। তাদের এই বিদায়কে সঠিক ও সুন্দরভাবে গুছিয়ে দেয়া মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য। তবে ইসলামিক নিয়মে জানাজা  নামায, দাফন ও কবর জিয়ারত সম্পর্কে সঠিক ধারনা নেই আমাদের অনেকেরই। তাই এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি জানাজা সম্পর্কে ভালো ধারনা দেয়ার।


    পোস্টটি শেয়ার করুন !

    Leave a Reply

    Your email address will not be published.

    কপিরাইট © 2021 BDBasics || সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত