কোমর ব্যথার আদ্যোপান্ত (কোমড় ব্যথার কারণ, প্রতিকার ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়)

    কোমর ব্যথা কমার উয়ায়
    পোস্টটি শেয়ার করুন !

    এই ধরুন, আড়মোড়া দিয়ে একটু সোজা হয়ে বসতে গেলেন, কোমরে ব্যথা লাগলো, আবার একটু চেষ্টা করলেন, দেখলেন, হ্যাঁ, ব্যথা লাগছে। একটু ঝুঁকে বসতে গেলেন, কোমড়ে ব্যথা। আবার ধরুন, কোথাও যাবেন, নিজের জুতাটা পড়তে গেলেন, কিন্তু কোমর ব্যথা। নুয়ে জুতোটা আর পড়তে পারলেন না। আবার হাঁটছেন, একটু সোজা হতে চাইলেন, পারলেন না! 

    অথবা তীব্র ব্যথা শুধু কোমর কেন, কোমড় থেকে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ব্যথা, পায়ে ব্যথা, আপনাকে শুয়েই থাকতে হচ্ছে! এ কেমন অস্বস্তি, খোদা! 

    কোমড়ের ব্যথা, হ্যাঁ, আপনি আমি কেন, যে কারো হতে পারে, যেকোনো বয়সের।

    কোমড়ের ব্যথা হতে পারে এক দিনের, হতে পারে দু দিন থেকে সাত দিনের, সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত যে ব্যথা থাকতে পারে, সেগুলোকে স্বল্প মেয়াদী কোমর ব্যথা বলা যেতে পারে।

    আর এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যদি নিয়মিতভাবে ব্যথা স্থায়ীভাবে আপনাকে পীড়ন করতে থাকে, এটা ক্রোনিক কোমড় ব্যথা। যথা সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কোনোই বিকল্প নেই।

    কোমর ব্যথা কেন?

    বংশগতভাবেই ক্ষয়ে যেতে পারে কোমড়ের হাড়। তাছাড়া এই ক্ষয়টা হতে পারে বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়াতেও।

    আবার যুবক থেকে মধ্যবয়সী যারা , এই ধরুন, ২৫-৪০ , এদের আবার হাড়ের ফাঁকা জায়গাটা পূরণ থাকে একটা চাকতির মতো ডিস্ক দিয়ে, এই ডিস্কের যদি আবার কোনো ওলট পালট হয়, স্থানচ্যুত হয় বা বেরিয়ে যায়, ব্যথা তো হবেই। ব্যথা না হলে বরং সেটা অস্বাভাবিক।

    আচ্ছা, আপনার কি অ্যাস্থমা আছে, প্রচন্ড কাশি হয়? 
    কাশি দিতে দিতেও দেখা যায়, কোমরের হাড়ের আরেক বেমালুম অবস্থা, 
    এসব ক্ষেত্রে খুব একটা ধারণা করে কিংবা ঘরোয়াভাবে নিজেই নিজের ডাক্তার বনে যাওয়ার থেকে অতিসত্বর একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী।
    

    কিভাবে বুঝবেন এই কোমর ব্যথা নিয়ে আর বসে থাকার জো নেই?

    নিচের যেকোনো একটা উপসর্গ যদি নিজের মধ্যে অনুভব করেন দয়াপূর্বক বসে থাকবেন না।’

    এই  ধরুন,

    ⇒ আপনার কোমরেও প্রচন্ড ব্যথা আছে, আবার একই সাথে জ্বরও আছে,
    
    ⇒ আপনার কোমড়ের ব্যথাও আছে,আবার শরীরের ওজনও ধুপ করে বিনা নোটিশে কমে গেছে।
    
    ⇒ আপনার কোমরের ব্যথাটাও আছে, আবার খাদ্যে নিদারুণভাবে অরুচি ধরে গেছে।
    
    ⇒ ব্যথার সাথে সাথে শরীর দেধারছে ঘামছে।
    
    ⇒ ব্যথাটা ধীরে ধীরে কোমর ছাড়িয়ে হাঁটু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে অথবা এক পা মোটামুটি রকমের ধরে গেলে তথা অবশ হয়ে গেলে অতিরিক্ত রকমের সতর্ক হয়ে যান।
    
    ⇒ আবার ধরুন, আপনার কোমড়ের ব্যথাটাও আছে, সাথে প্রস্রাব পায়খানা সম্বন্ধীয় কোনো জটিলতার আবির্ভাব হয়েছে কিংবা মলদ্বারের আশেপাশে কোনোকিছু টের পাচ্ছেন না, অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে, মেরুদন্ডে বক্রতার আশঙ্কা হচ্ছে, পায়ে শক্তি পাচ্ছেন না, কিংবা পায়ের মাংসপেশি একটু বেশিই শুষ্ক শুষ্ক লাগছে, জী, নিজে নিজে চালাকি করতে যাবেন না। যা নিজে পারবেন না, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় পড়েও থাকবেন না। সুতরাং ডাক্তার দেখান, যান!

    বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ অনিয়মিত কায়িক পরিশ্রমেও দেখা দিতে পারে স্বল্প মেয়াদী কোমর ব্যথা তবে প্রাথমিক ভাবে খুব একটা চিন্তিত হবার কারন না থাকলেও ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে আপনি তো জানেন ই কী করতে হবে।

    আর তাছাড়া উপরে উল্লেখিত লক্ষণ গুলো কিন্তু শুধু কোমর ব্যথা না হয়েও হতে পারে অন্য বড় কোন রোগের লক্ষণ । যা কোমরটাকে প্রথমে ধরেছে।

    আরও পড়ুনঃ মেথির ১৮টি উপকারিতা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নিন

    অন্য কোন লক্ষন টের পেলে বুঝে নেবেন আরো সতর্ক হতে হবে?

    এমন কী কখনো হয়েছে যে আপনি হাঁটতেই পারছেন না?

    হতে পারে এটাও কিন্তু আপনার কোমরে সমস্যার কারনেই হলো। আরো যা যা হতে পারে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পা অবশ হয়ে গেলো, পা দিয়ে পাড়া দিলে মনে হয় পা টা খানিক বেশিই ভারী হয়ে আছে।

    ব্যথা কোমর থেকে পায়ে ছড়িয়ে ঝিন ধরে গেলো, কিংবা মাংস পেশীতে টান ধরলো।

    কোমর ব্যথা প্রতিকারের চেয়ে ঘরোয়া প্রতিরোধ উত্তম!

    সব সময়ই প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ উত্তম। ঘরোয়াভাবে চাইলেই আপনি অনেকভাবে কোমর ব্যথার মতো দুঃসহ যন্ত্রণাকে এড়িয়ে যেতে পারেন।

    প্রতিরোধের উপায়গুলো কি তবে?

    ⇒ সটান হয়ে এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
    
    ⇒ আবার এক জায়গায় অনেকক্ষণ ধরে বসেও থাকবেন না।
    
    ⇒ ছোট্ট একটা ঘুম টিপসঃ ঘুমানোর সময় সোজা হয়ে ঘুমান এবং ওঠার সময় এক কাত হয়ে ওঠার অভ্যাস গড়ুন।
    
    ⇒ নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।
    
    ⇒ ঝুঁকে যেকোনো কার্য সম্পাদন থেকে বিরত থাকুন।
    
    ⇒ ধরের সাথে কিন্তু আপনার কোমড়ের খুব দারুণ একটা ঐশ্বরিক সংযোগই আছে বলা চলে। আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টির যে তুলনা হয়না। চেষ্টা করবেন ঘাড়ে এমন কোনো ভারী কিছু না তুলবার। এতে কোমরে চাপ পড়লেও পড়তে পারে। বিধি বাম হলেও হতে পারে।
    
    ⇒ শক্ত বিছানায় ঘুমাবেন। নরম আরামদায়ক ঢালু কিছুতে বসবেন না বেশি সময় ধরে। এতে কোমরের ক্ষতি হতে পারে।

    জানার জন্য জানতে হবে, কোমর ব্যথার পরীক্ষাগুলো কী? কেমন? 

    কোমড়ের কোনো সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার যে টেস্টগুলো আপনাকে করাতে বলতে পারে, তন্মধ্য সবথেকে বেশি কমন টেস্টগুলোর নাম যথাক্রমে

    ⇒ এইচ এল বি ২৭ - খুব গুরুতর দীর্ঘস্থায়ী কোমড়ের পেছন ভাগের ব্যথা থাকলে এই টেস্টটি করাতে বলে ডাক্তার।
    
    ⇒ কোমড়ের এক্স রে আর এম আর আই । এম আর আই বলতে ম্যগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং।
     
     ⇒ এছাড়া স্নায়ুর সাথেও তো কোমড়ের খুব গভীর থেকে গভীরতর একটা সম্পর্ক রয়েছে বৈকি! সেজন্য নিউরোলজিক্যাল ডেফিসিয়েন্সি নির্ণয়ের জন্য আলাদা কিছু টেস্ট ও করাতে পারে।
    
    ⇒ সাথে আরো করাতে পারে, রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ, ক্যালসিয়াম নির্ণয় পরীক্ষা ইত্যাদি।
    

    প্রতিরোধে না এড়ানো গেলে কোমর ব্যথার প্রতিকার

    প্রতিরোধে করণীয় কী কী তা তো জানলেন ই। এবার জানুন একেবারে প্রাথমিক প্রতিকারের কিছু করণীয়।

    ⇒ কোমরে গরম ভাপ নিতে পারেন। ছোট্ট একটা ব্যাগে গরম পানি ভরে নিয়ে কিংবা বোতল দিয়েও কাজ সারতে পারেন। ভালো লাগতে পারে।
     
    ⇒ ব্যথা শুরু হওয়া মাত্রই পূর্ণ বিশ্রামে চলে যেতে হবে। তালাশ, একুশের চোখ ইত্যাদি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুষ্ঠানগুলোতে যেমন বলে, আজ যাচ্ছি তবে যাচ্ছি না, ঠিক তেমনি আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, বিশ্রাম নিচ্ছেন কিন্তু নিচ্ছেন না দীর্ঘক্ষণ! দীর্ঘ সময়ের বিশ্রামে কিন্তু আবার নতুন বা অন্য ধরনের কোন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
    
    ⇒ কোমর ব্যথার প্রচলিত প্রাথমিক কিছু মলম নিয়ে দেখতে পারেন, ভালো হয়ে গেলে তো হয়েই গেলো। না হলে আর কি, মালিশ করতে যাবেন না কিন্তু! সাধু সাবধান।
    

    কোমর ব্যথায় সর্তকতা ও ব্যায়ামের স্বরূপ

    • ডাক্তার দেখে যদি মনে করেন যে আপনাকে ফিজিও থেরাপী দিতে হবে, চাইলে উনি আপনাকে সপ্তাহ খানেকের জন্য ভর্তিও নিয়ে নিতে পারে। তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

    আবার মনে রাখতে হবে, সতর্কতারও মার নেই,। যতো দ্রুত সতর্ক হতে পারবেন, ততোই কম ঝক্কি ঝামেলায় সুস্থ হবার প্রবণতা ও সম্ভাবনা দুটোই বেশি থাকবে।

    স্ট্রেচিং, ম্যানিপুলেশান , মাসল স্ট্রেন্দেনিং ও করানো লাগতে পারে আপনাকে বিধি যদি বেশিই বাম হয়ে থাকে আর কি!

    কোমর ব্যথা হলেই যে বড় কিছু হয়ে গেছে এমন ভাবার কারণ নেই।

    কোমড় ব্যথা হলেই যে কিডনী জনিত কোনো সমস্যা হয়ে গেছে এমন ভাববার কিন্তু কোনোরকমের কোনো অবকাশ নেই। আবার ব্যথা শুরু হয়েছে, মন চাইলেই ওষুধ খেয়ে ফেললেন এমনটা কিন্তু কখনোই করবেন না। 

    সাদাস্রাব জনিত জটিলতার কারনেও হতে পারে কোমর ব্যথা।

    কোমর ব্যথার প্রধান হোমিও ওষুধ গুলো হচ্ছে রাসটক্স, ব্রায়োনিয়া এলবাম , এস্কিউলাস হিপ, কলোসিন্থিস, সিমিসিফিউগা, স্ট্রনশিয়াম কার্ব, ফাইটোলাক্কা, নেট্রাম ক্লোরেট ইত্যাদি।

    কোমর ব্যথায় হোমিওপ্যাথি ঔষধ/ হোমিওপ্যাথির অবদান

    কারো কারো মতে কোমর ব্যথা নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাই সবচাইতে বেশি কার্যকরী। খানিক দীর্ঘমেয়াদি হলেও।

    ⇒ ওঠা বসা নড়াচড়া তে যদি ব্যথা হয় আর হাঁটাহাঁটি করে যদি ব্যাথাটা কমে যায় তাহলে বুঝতে হবে রাস টক্স প্রয়োগের একটা ভালো লক্ষণ ইতোমধ্যেই আপনার চোখের সামনে। 
    
    ⇒ আর তাছাড়া যদি ব্যথা পুরোপুরি উপশম না হয় রাসটক্স এর প্রয়োগ এর পরেও তবে মোটা মেয়েদের যুক্ত রোগীদের ক্যালকেরিয়া ফ্লোর দিয়ে  দেখা যেতে পারে।
    
    ⇒ আরে স্থায়ীভাবে উপশম না হলে যদি কিডনি-জটিলতা দেখা যায় তাহলে বারবারিস ভালগারিস দারুণভাবে কার্যকরী।
    
    ⇒ বিশ্রামে ব্যথা এমনিতেই দূর হয়ে যায় তারপরেও যদি দরকার পড়ে তবে ব্রায়োনিয়া এলবাম আপনার ত্রূপের তাস হতে পারে। বাতের সমস্যায় ও এই ঔষধের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।

    নিয়মিত ব্যায়াম এবং সবকিছুরই নিয়মিত শৃঙ্খলা রক্ষার তো কোনো বিকল্পই নেই দুঃসহ কোমরের যন্ত্রণা এড়িয়ে থাকার জন্য।

    কোমর ব্যথার ব্যায়াম 

    যোগ ব্যয়াম

    শলভাসন করতে পারেন। যোগব্যায়ামের একটা ধরণ এটা।

    উপুড় হয়ে শুয়ে পা মাটিতে লাগিয়ে রাখা অবস্থায় উল্টোদিকে তথা পিঠের দিকে দুই হাতের কব্জি এক করে পায়ের পাতা টানটান রেখে শ্বাস নিয়ে মাথা বুক উপরে নিচে ওঠানামা করুন ন্যূনতম ৬ থেকে ১৬ বার। গলায় হালকা টান পড়বে।

    নিয়ম ও চর্চা

    সমান কোমল বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে দুই পাশে দুই হাত রেখে সটান হয়ে সোজা শুয়ে থাকবেন কিছুক্ষণ। এরপর হাট খাজনা করে সটান করেই এক পা সর্বোচ্চ উপরে তুলুন।

    ন্যূনতম ৭ থেকে ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত পা তুলে রাখুন। আবার অন্য পা উপরে তুলুন ,সময় নিন এবং এভাবে দিনে তিন থেকে চার বার কোমরের ব্যায়াম করতে পারেন নিয়মিত।

    কোমর ব্যথার ব্যয়াম সম্পর্কে জানুন নিচের ভিডিও থেকে।

    কোমর ব্যথায় কিছু কথা শেষ কথা

    কোমরের জটিলতা মুক্ত থাকতে পারবেন এবং একইসাথে স্বল্পসময়ে ব্যথাও নিরাময় করতে পারবেন যদি থাকে।

    হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি সবকিছুই আপনার ইচ্ছা। তবে ওই যে ব্যাথা হবার থেকে ব্যথাটা যেন না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখাটাই আপনার দায়িত্ব এবং কর্তব্য হওয়া উচিত।

    তাহলে আজ এ পর্যন্তই। আমাদের সাথেই থাকবেন।

    References:

    https://www.medicalnewstoday.com/articles/172943

    https://www.medicalnewstoday.com/articles/323204


    পোস্টটি শেয়ার করুন !

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    কপিরাইট © 2021 BDBasics || সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত